বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন
সারাদেশে

জন্ম–মৃত্যু নিবন্ধনে ধীরগতি, অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা

  • আপডেট সময়: সোমবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২১ দেখেছেন :

ঢাকা অফিস

বাংলাদেশসহ এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (ইউএনএসকাপ) ঘোষিত সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস (সিআরভিএস) দশক ২০১৫-২০২৪ -এর অংশীদার।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এই সময়সীমা আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। এই দশকের মূল লক্ষ্য একটাই ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ সরকারও এই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার করেছে। তবে সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

বাস্তব চিত্র কি লক্ষ্য পূরণের পথে আছে?

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে জন্ম নিবন্ধনের গড় হার ৭৭ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়াতে ৭৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাপি মৃত্যু নিবন্ধনের গড় হার ৭৪ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশে জন্ম নিবন্ধনের হার মাত্র ৫০ শতাংশ, যে জায়গায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ যেমন মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় জন্ম নিবন্ধনের হার প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, দেশে মৃত্যু নিবন্ধনের হার কেবল ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুইজন মানুষের একজন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পরিচয়ের বাইরে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ২০৩০ সালের আর মাত্র কয়েক বছর বাকি। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, অথচ অগ্রগতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১৬.৯ লক্ষ্য—“সবার জন্য বৈধ পরিচয়”, যার মধ্যে জন্ম নিবন্ধন অন্তর্ভুক্ত—কে প্রায়ই একটি কারিগরি লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি একটি গেটওয়ে লক্ষ্য। এই একটি লক্ষ্য পূরণ না হলে এসডিজির অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে। যেমন, দারিদ্র্য বিমোচন (এসডিজি ১), সুস্বাস্থ্য (এসডিজি ৩), মানসম্মত শিক্ষা (এসডিজি ৪), বৈষম্য হ্রাস (এসডিজি ১০), এবং টেকসই নগর ও জনপদ (এসডিজি ১১), সবগুলোর সাফল্যই নির্ভর করে মানুষকে সঠিকভাবে গণনায় আনার ওপর। দারিদ্র্য বিমোচন (এসডিজি ১) সম্ভব নয় যদি দরিদ্র মানুষকেই চিহ্নিত করা না যায়, বা তারা সামাজিক সুরক্ষা বঞ্চিত হয়। সুস্বাস্থ্য (এসডিজি ৩) নিশ্চিত করা যায় না যদি জানা না থাকে কোন রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে, কোথায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, বা কোন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে। মানসম্মত শিক্ষা (এসডিজি ৪) ব্যাহত হয় যখন জন্মসনদ না থাকায় শিশুরা স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। বৈষম্য হ্রাস (এসডিজি ১০) ও টেকসই নগর (এসডিজি ১১)—সবকিছুর মূলে রয়েছে মানুষকে গণনায় আনা। ফলে এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়নই হয়ে পড়ে অসম্ভব।

এই বাস্তবতা কি ২০৩০ সালের বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এ বিষয়ে প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-এর নির্বাহী পরিচালক, এবিএম জুবায়ের বলেন, “নিবন্ধনহীনতা মানে পরিচয়হীনতা। নিবন্ধনহীন মানুষ রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য। আর অদৃশ্য মানুষকে ঘিরে কোনো ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থতা। বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের সাফল্যের কথা বলে, তখন নির্ভরযোগ্য ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের অভাব সেই দাবিকে দুর্বল করে দেয়। আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, প্রমাণ দিয়ে অর্জন করতে হয়। আর সেই প্রমাণের ভিত্তি হলো জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন।

এবিএম জুবায়ের আরও বলেন, “শক্তিশালী জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পনাকে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর করে তুলে। অন্যদিকে, নিবন্ধন তথ্য ঘাটতি মানে রাষ্ট্র পরিকল্পনা গড়ে উঠে অনুমানের ওপর। নীতিনির্ধারণ হয় অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে। বাজেট বণ্টন, স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা, সবখানেই তৈরি হয় অদৃশ্য ফাঁক।”

এই সমস্যার কোথায়?

বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ প্রণয়নের পর কিছু অগ্রগতি হলেও বর্তমান আইনে কিছু মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। নিবন্ধনের প্রধান দায়িত্ব পরিবারকেন্দ্রিক, অথচ দেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জন্ম ঘটে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ফলে জন্মের মুহূর্তেই রাষ্ট্রের খাতায় শিশুকে যুক্ত করার সুবর্ণ সুযোগটি হারিয়ে যায়। এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশ এই সমস্যার সমাধান করেছে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এটি সম্ভব হলেও আইনি বাধ্যবাধকতার অভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি। এর পাশাপাশি, নিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস তৈরির বাধ্যবাধকতা আইনে নেই। ফলে এই মূল্যবান তথ্য রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। নিবন্ধনের ভুল সংশোধনে অতিরিক্ত ফি, প্রযুক্তিগত জটিলতা, জনবল সংকট ও দুর্বল আন্তঃখাত সমন্বয় দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে নিবন্ধন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একটি বানান ভুল বা জন্মতারিখ সংশোধন অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী জানান, “আমার সন্তানের জন্ম নিবন্ধনের সময় হাসপাতাল থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দৌড়াতে হয়েছে। কখনো বলছে কাগজ ঠিক নেই, কখনো তথ্য মিলছে না, আবার কখনো সিস্টেম কাজ করছে না। ছোট্ট একটি বানান ভুল ঠিক করতেও সময়, টাকা আর ধৈর্য—সবকিছুরই পরীক্ষা দিতে হয়েছে।”

গ্লোবাল হেল্থ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড, মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, “বাংলাদেশের ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে, আইন সংস্কারকে এসডিজি ত্বরান্বিত করার কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ সকল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব আইনগতভাবে প্রদান করতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা গেলে, হাসপাতালে জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এর ফলে আমরা টেকসই উন্নয়ন এবং সিআরভিএস দশক উভয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হবো।”

তিনি আরও বলেন, “এছাড়াও, নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস তৈরির বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভুল সংশোধনের ফি মওকুফ করা ও প্রয়োজন। আইন সংশোধনের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ে জনবল, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা জরুরি।”

২০৩০ খুব কাছেই। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে হলে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ মানুষকে গণনায় না এনে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শক্তিশালী না হলে, বৈশ্বিক অঙ্গীকার শুধু কাগজেই থেকে যাবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অনন্য ক্যাটাগরির সংবাদ
© All rights reserved © Comillakantha.com
Theme Customized By Mahfuz