
ঢাকা অফিস
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আর বাকি ১০ দিন। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত দলগুলো। নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যেও নানা সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই থেমে নেই। এর মধ্যে মাঠ প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ, দলগুলোর মরিয়া অবস্থান, আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মিলিয়ে নির্বাচনের আগে শেষ পর্যন্ত দেশের পরিস্থিতি কতটুকু শান্ত থাকে, কতটা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে জনমনে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই সহনশীলতার অভাব রয়েছে। যার প্রভাব পড়ে নির্বাচনেও। এদিকে গত দুই বছরে জুলাই ঐক্যেও ধরেছে ফাটল। রাজনৈতিক সহাবস্থনটা আর নেই। ফলে প্রচারণা ঘিয়ে কথা লড়াই, যা এক সময় পর্যবসিত হচ্ছে প্রাণঘাতী সংঘাতেও। শুধু জানুয়ারি মাসেই ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতায় ৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক।
নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের। তারা বলছেন, সরকারের ভেতরকার একটি অংশ জাতীয় নির্বাচন চায় না। তারা শুধু গণভোটে আগ্রহী। এ ছাড়া প্রশাসনে জামায়াতের আধিপত্য সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়। প্রশাসন জামায়াত-এনসিপির প্রতি ঝুঁকে আছে। তাতে পাতানো নির্বাচনেরও আশঙ্কা করছেন অনেকে। এ ছাড়া বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক শক্তির তৎপরতাও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি একটি গণমাধ্যমকে জানান, ১২ তারিখ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়াই সবার জন্য খুব কঠিন হবে। আর যদি ইলেকশন হয়ও, সেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি খারাপ নির্বাচনের নজির হয়ে থাকবে এবং ভোটের দিনেই নির্বাচনটি আনম্যানেজেবল হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে, ক্ষমতার স্টেকহোল্ডাররা খুবই অ্যাগ্রেসিভ এবং অন্তর্বর্তী সরকার একেবারেই আন্তরিক নয়; সরকার যে নির্বাচন চায়, সেটা তার দৈনন্দিন কার্যাবলি দেখলে মনে হবে না। এ সরকার নতুন নতুন প্রকল্প, নতুন নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে, যেগুলো তার এখন করার কথাই নয়।’
নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ রয়েছে। তারা মনে করছেন, ভোট দিতে গেলেও তার বিপদ, না গেলেও বিপদ। তাই এবারের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে সবার। বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ একদমই সক্রিয় নয়। অনেক দিন ধরে মাঠে থাকায় সেনাবাহিনীও ক্লান্ত। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একেবারেই অনুকূলে নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একে অপরের প্রতি অনেকটা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। যা যে কোনো সময় বড়োসড়ো সংঘাতের দিকে যেতে পারে।
প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে নির্বাচনি প্রচারণা : বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবরের মধ্যে জানুয়ারি মাসে মোট ৬৪টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছে ৫০৯ জন। তাদের মাসিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনি সহিংসতা ছিল এ মাসের (জানুয়ারি) অন্যতম ‘সবচেয়ে ভয়াবহ’ মানবাধিকার সংকট। এর বাইরে চলতি মাসে ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ২১৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুষ্কৃতকারীর হামলায় মারা গেছেন ছয়জন।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে এমএসএফ বলছে, ‘এটি প্রমাণ করে যে, জানুয়ারি মাসে নির্বাচনি প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজাহর নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফ সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৩টি ঘটনা বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষের।
এ ছাড়া বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৩টি, বিএনপি-স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ৯টি সংঘর্ষ, গণঅধিকার পরিষদ-স্বতন্ত্রের একটি এবং বিএনপি-এনসিপির মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে। আর ২৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৬টি, বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের দুটি এবং বিএনপি-জামায়াতের পাঁচটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন, যাদের সবাই বিএনপির কর্মী ও সমর্থক। সব মিলিয়ে নির্বাচনের শেষ দশ দিনে এ সহিংসতার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।