বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন
সারাদেশে

ডাক দিলে ছুটে আসে বক

  • আপডেট সময়: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭১ দেখেছেন :

 

হোমনা প্রতিনিধি

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার হাভাতিয়া নদীর শান্ত স্রোতের কোল ঘেঁষে মহিষমারী গ্রামের এক মাটির বাড়ি—দেখতে যেন নিভৃত প্রাকৃতিক রাজ্য।

চারদিকে সবুজ, আর সেই সবুজের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মায়াময় প্রাণলোকে ভরা সংসার। কোথাও বকের পায়ের টুংটাং, কোথাও ঘুঘুর মৃদু ডাকা, শালিকের লাফালাফি, খরগোশের কদমফুল ছোঁয়া দৌড়, বিড়াল–কুকুরের নিশ্চিন্ত ঘুম। আর এই বৈচিত্র্যময় প্রাণবৈচিত্র্যের কেন্দ্রবিন্দু একজন মানুষ মো. আবুল কাশেম ভূঁইয়া (৪৩)।

উত্তরে হোমনা উপজেলার মহিষমারী, দক্ষিণে তিতাসের পুরান বাতাকান্দি—এই দুই জনপদের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে হাভাতিয়া নদী। নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা কাশেমের বাড়িটি যেন নদীবেষ্টিত এক নিরালা দ্বীপ; সকালে ঘুম ভাঙে নদী আর গাছের যৌথ কলরোলে।

প্রতিদিন ভোরেই শুরু হয় এক অন্যরকম দৃশ্য। কাশেম বকের মতো ডাক দেন। মুহূর্তেই পুকুরের ওপাশ থেকে উড়ে আসে দুটো সাদা বক। কেউ তার কাঁধে বসে, কেউ হাতে, কেউ আবার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। হাতের ছোট পাত্র তুলে কাশেম যখন এক মুঠো মাছ এগিয়ে দেন—পাখিগুলোর চোখে তখন অপার নির্ভরতার আলো।
এই দুই বক তিন মাস ধরে তার কাছে আছে। অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া এই পাখিগুলোকে সেবা-শুশ্রূষায় সুস্থ করে তুলেছেন তিনি।

“আমি কোনো পাখিকে কখনো খাঁচায় রাখি না। অসুস্থ পেলেই চিকিৎসা করি, আর সুস্থ হলেই ছেড়ে দিই মুক্ত আকাশে।”

তার ঘরজুড়ে রয়েছে খরগোশ, বিড়াল, কবুতর, দেশি হাঁস, এমনকি অসহায় পথকুকুরও। কেউ অসুস্থ, কেউ পরিত্যক্ত—কাশেমের বাড়িতে সবার জন্যই রয়েছে নির্বিঘ্ন আশ্রয়। ঘরের দক্ষিণ জানালার পাশে আমগাছের ডালে নিশ্চিন্তে ডিমে তা দিচ্ছে একটি ঘুঘু; মানুষের ভয়ে সে সরে যায় না—কারণ সে জানে, এই বাড়ির মানুষরা প্রাণীর ক্ষতি করে না।

কাশেমের শিক্ষিকা স্ত্রী এবং দুই সন্তানও তার এই নিঃস্বার্থ প্রাণীসেবায় সহযোগীতা করেন।

টিনের চালা,মাটির মেঝে কিন্তু অভাব নেই আনন্দের।অবসরে বসে দোতরা বা গিটার বাজান কাশেম,আধ্যাত্মিক গান গেয়ে সময় কাটান। তার মতে, যারা প্রাণীকে ভালোবাসে তারা কখনো একা থাকে না।

তিতাসের ওপারের যুবকেরা—ইমন, রায়হান, ইমরান নদী সাতরিয়ে চলে আসে বক দুটির সঙ্গে কাশেমের অদ্ভুত সখ্য দেখতে। তাদের ভাষায়,
“ময়না বা টিয়া মানুষের ডাকে আসে—শুনেছি। কিন্তু বক ডাকলে মানুষের কাছে আসে—এ দৃশ্য প্রথম দেখলাম।”
স্থানীয় যুবক তাওহীদ বলেন,
“কাশেম ভাই ডাকলেই বকগুলো ছুটে আসে। দেখতে অপূর্ব লাগে।”

প্রায় তিন দশক ধরে প্রাণীদের প্রতি মায়ায় তিনি যা করে চলেছেন, তার শুরুটি ছিল নাটকীয়। ১৯৯৩ সালের এক ঝড়ে বাড়ির পাশের মান্দার গাছ থেকে একটি বাসা পড়ে গেলে ছানাগুলোকে কেঁচো খাইয়ে বড় করেন তিনি। সেই দিনই তার জীবনে বদলে যায় অনেক কিছু।
তার স্মৃতিচারণ,
“ছানাগুলোকে দেখে মনে হয়েছিল, আমরাও তো বাবাহারা। ওদের কষ্ট আর আমাদের কষ্ট একই মনে হয়েছিল।”

তিতাসের এক এলাকায় কিছু শিকারি বকের বাসা ভেঙে ছানা নিত। কাশেম বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে সে অনৈতিক শিকার বন্ধ করান। একসময় দুই বকের ছানা ফেলে রেখে পালিয়ে যায় শিকারিরা; সেসব আহত ছানাকেই কাশেম তুলে এনে সেবা দিয়ে বড় করেন। পরে আকাশে ছেড়ে দেন। আশ্চর্যজনকভাবে বড় হওয়া সেই বকরাই আজ তার বাড়ির গাছেই বাসা বেঁধেছে—এবং প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকে তার হাতে ধরা ছোট পাত্রের এক মুঠো মাছের।

অসুস্থ প্রাণীর চিকিৎসাকেন্দ্রও যেন হয়ে উঠেছে তার বাড়ি। কোথাও পাখি বা প্রাণী আহত দেখলেই স্থানীয়রা নিয়ে আসে তার কাছে। কাশেম ওষুধ দিয়ে সুস্থ করেন এবং সুস্থ হলে প্রশান্তির হাসি নিয়ে তাদের উড়িয়ে দেন আকাশে।
একবার টুনটুনির বাসা কলাগাছ কাটতে গিয়ে নষ্ট হলে ছানাগুলোকে উদ্ধার করে পোকার ডিম সুইয়ের মাথায় গেঁথে খাইয়েছেন—এমন নিখুঁত যত্নের কথাও জানান তিনি।

বন বিভাগের চান্দিনা রেঞ্জ অফিসার ও হোমনার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন,
“কাশেম ভূঁইয়ার কথা শুনেছি পাখিপ্রেমী।যদি খাঁচায় আটকিয়ে পালন না করে তাহলে সমস্যা নাই।বকের ছানা দুটো তার সেবা পেয়ে হয়তো তার প্রতি মায়া জন্মেছে তাই তার ডাকে সাড়া দেয়। বন্য প্রাণীরা স্নেহ ও খাবার পেলে পোষ মানে।’’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অনন্য ক্যাটাগরির সংবাদ
© All rights reserved © Comillakantha.com
Theme Customized By Mahfuz