
নিজস্ব প্রতিবেদক
কুমিল্লার সেনানিবাসের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ময়নামতি কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রিতে শনিবার (৮ সেপ্টেম্বর) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও স্মরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শান্ত ও সুনিবিড় পরিবেশে সকাল ১০টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি সাত দেশের হাইকমিশনার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ১১টা ৪০ মিনিটে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।
ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট এলাকার পাশেই প্রায় চার একর বিস্তৃত একটি এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই সমাধিক্ষেত্র। সবুজ ঘাসে মোড়া জমিন, সুসজ্জিত গাছপালা, আর সমাধিফলকের সযত্ন রক্ষণাবেক্ষণ সব মিলিয়ে এটি দর্শনার্থীর মনে এক গভীর প্রভাব ফেলে।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ৭৩৭ জন সৈনিকের সমাহিত সমাধি রয়েছে। এর মধ্যে এখানে সমাহিত রয়েছে যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন সৈনিক, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের চারজন, অবিভক্ত ভারতের ১৭১ জন, রোডেশিয়ার তিনজন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন ও পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন সৈনিক। প্রথমে সংখ্যাটি ছিল ৭৩৭, কিন্তু জাপানের ২৪ জনের দেহাবশেষ স্বদেশে ফেরানোর পর বর্তমানে এখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন ৭১৩ জন সৈনিক।
অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মেহেদী হাসান চৌধুরী পিএসসি, কমান্ডার ১০১ পদাতিক ব্রিগেড।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির বাংলাদেশ কান্ট্রি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আব্দুর রহিম সবুজ শনিবার (০৮ নভেম্বর) রাতে স্মরণ অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারা কুক, পাকিস্তানের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর সাইয়েদ আহমেদ মারুফ, ভারতের ডিফেন্স এডভাইজার ব্রিগেডিয়ার এম.এস. সাবরওয়াল, অস্ট্রেলিয়ার কূটনীতিক নার্দিয়া সিম্পসন, কানাডার প্রতিনিধি মার্কাস ডেভিস, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি, ইতালির রাষ্ট্রদূত অ্যান্টোনিও আলেসান্দ্রো, স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল সিস্টিয়াগা, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি মাইকেল মিলার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি মেগান বোল্ডিন, ডেনমার্কের প্রতিনিধি অ্যান্ডারস বি. কার্লসন এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্টিফেন ফোর্বস।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি কমান্ডার, ১০১ পদাতিক ব্রিগেড; অধিনায়ক, ৬ ক্যাভালরি; অধিনায়ক, ৩৩ মিলিটারি পুলিশসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের পরিবার ও বংশধরসহ মোট ১৮৪ জন।
স্মরণ অনুষ্ঠানটি জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, স্মরণ সংগীত পরিবেশনা, দুই মিনিট নীরবতা পালন, পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং প্রার্থনা ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুমিল্লা জোনের কর্মকর্তারা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করেন।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্মৃতিস্তম্ভ। এটি কেবল সৈনিকদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ করে না, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইতিহাস ও সাহসিকতার স্মৃতি হিসেবে স্বীকৃত। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা ইতিহাসকে সম্মান জানাতে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শান্তি বার্তা প্রচার করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
এই সমাধি ও স্মরণ অনুষ্ঠান দেশের ইতিহাস চর্চা, আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব ও কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচিত।