
প্রতিনিধি, চান্দিনা
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে জনগণ। জমির খাজনা পরিশোধ থেকে শুরু করে নামজারি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুষ আর দুর্নীতি। দালালদের মাধ্যম ছাড়া কোন কাজই হচ্ছে না এই দপ্তরটিতে। প্রতিটি নামজারি ফাইলে দালালদের চুক্তির চিহ্ন না থাকলে ওই ফাইল নানা অযুহাতে বাতিল করে দেয় সংশ্লিষ্টরা। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
সরকারি বিধিমোতাবেক অনলাইনে একটি নামজারি আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা তা যাচাই-বাছাই করে আবেদনটি সার্ভেয়ারের আইডিতে পাঠানো হয়। উপজেলা সার্ভেয়ার সরেজমিন তদন্ত করে জমির দখল ও পরিমাণ যাচাই করার কথা। তার প্রতিবেদনের পর কাননগো সর্বশেষ যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শুনানীর দিন ধার্য করেন এবং পরবর্তীতে এসি ল্যান্ড অনুমোদন দেয়ার কথা। এসকল প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে হওয়ার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ঘুষ ছাড়া সেই ফাইল অনুমোদন থাক দূরের কথা টেবিল পরিবর্তনই হয় না।
অনুসন্ধানে জানা যায়- নামজারীর যে কোন আবেদন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার কাছে গেলেই ওই আবেদনের হার্ড কপি চায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। খুঁজেন এই আবেদনের দালাল কে? যদি তাদের নির্ধারিত দালাল না হয়, তাহলে আবেদনকারীর সাথে চুক্তি করেন ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা। চুক্তির পর আবেদনের হার্ড কপির উপর অংশে সাংকেতিক চিহ্ন দেয়া হয়। ওই চিহ্ন দেখে পরবর্তী ধাপগুলো অতিক্রম হয় এবং সংশ্লিষ্টরা কোন চিহ্ন যুক্ত কতটি ফাইল অগ্রগতি করেছেন সেগুলো হিসেব রাখেন এবং সপ্তাহ শেষে ঘুষ লেনদেন করেন। শুনানীতে চলে শেষ রফাদফা। চিহ্নযুক্ত ফাইল ও নামজারীর ধরণ দেখে চুক্তি করেন এসি ল্যান্ড নিজেই। বনিবনা হলে ফাইল মঞ্জুর, আর না হলে নামঞ্জুর। এই প্রক্রিয়ায় যারা যান না, তাদের ফাইল নানা অযুহাতে বাতিল করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট দালালদের নিয়ে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত চুক্তিকৃত ফাইলগুলোর টাকা লেনদেনের পর অনুমোদন করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নুর।
উপজেলার হারং গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হক জানান- আমার এক আত্মীয়ের একটি নামজারীর আবেদন করার পর ফাইলটির অগ্রগতি না হওয়ায় এসি ল্যান্ড অফিসে যোগাযোগ করি। এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে নামজারী করতে হয়েছে। তিনি আরও জানান- কেরণখাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানও ৯০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে অপর একটি নামজারী করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক জানান- চান্দিনা বাজারের একটি নামজারী করতে গেলে নানা সমস্যা ও অযুহাত দেখিয়ে বাতিল করে দেন। দীর্ঘদিন হয়রানির পর ২ লাখ টাকা চুক্তিতে ওই নামজারীটি করতে বাধ্য হই। তিনি আরও জানান- মূলত চুক্তি না করলে কোন ফাইল অনুমোদন হয় না।
কালিয়ারচর গ্রামের আব্দুল আলী খোন্দকার জানান- আমি সকল সঠিক কাগজপত্র দিয়ে একটি নামজারীর জন্য দুইবার আবেদন করি, দুইবারই নানা অযুহাতে আবেদনটি নামঞ্জুর করা হয়। মূলত আবেদন করার পর প্রতিটি ইউনিয়ন অফিসের তহসিলদারের সাথে টাকার চুক্তি করলে তিনি এসি ল্যান্ড পর্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে নামজারী করে দেন। আর যারা চুক্তি না করে নিজের ফাইল নিজে নিয়ে যান তাদেরকে অনেক সমস্যা দেখিয়ে হয়রানি করার পর ফাইলটি নামঞ্জুর করা হয়।
এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নুর জানান- ‘কেউ বললেই কি সত্য প্রমাণিত হয় নাকি? আমাকে কেউ ঘুষ দিয়েছে এমন ভিডিও কি দেখাতে পারবে’? এসব ঘটনা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত।’ ঘুষ লেনদেনের সময় কেউ কি ভিডিও করে রাখে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন- ‘কেউ যদি আমাকে ঘুষ দেয় তার কাছে প্রমাণ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ’