
প্রতিনিধি, দেবিদ্বার
মাত্র ৫০ হাজার টাকা তাও বাকিতে নিজের কন্যাশিশুকে বিক্রি করে দেন তার মা আকলিমা বেগম। পরে তিনি নিজেকে বাঁচাতে নিজেই কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার সাবের বাজার এলাকায় গিয়ে সড়কের পাশে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন দৌড়ে এলে তিনি তাদের কাছে জানতে চান ‘আমার সন্তান কোথায় ?
এসময় উপস্থিত লোকজন দেবপুর ফাঁড়ি পুলিশকে বিষয়টি জানালে পুলিশ প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সন্ধ্যায় তাকে তার পরিবারের কাছে তুলে দেন। এই ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে সবাই অপহরণ হিসেবে ধরে নিলেও পুলিশের তদন্ত ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েছে আসল রহস্য।
গত বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুুপুরে ২৭ দিনের শিশু হাফসাকে উপজেলা সদর এলাকায় চিকিৎসা করাতে এনে এক নিঃসন্তান দম্পত্তির কাছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বাকিতে বিক্রি করে দেন তার মা আকলিমা বেগম। এরপর নিজের শিশু সন্তানকে অপহরণের নাটক সাজান তিনি। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রায় ৩৫ ঘন্টার পর শুক্রবার রাতে দত্তক নেওয়া নিঃসন্তান দম্পত্তি আবু সাঈদ ও তাঁর স্ত্রী এসে পুলিশের মাধ্যমে শিশুটিকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।

অভিযুক্ত মা এবং শিশুর ছবি
আকলিমা বেগম কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ড বড়আলমপুর গ্রামের খলিল মাস্টারের বাড়ির দিনমজুর মো. কামাল হোসেনের স্ত্রী।
অভিযুক্ত আকলিমা বেগম বলেন, ‘‘আমার ভুল হয়েছে, অন্যায় হয়েছে, আমি বুজতে পারেনি’’। আমাকে হাসপাতালের নার্স বলছিল মেয়ের মাথায় নাকি সমস্যা সে বড় হলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হবে, তার চিকিৎসার করানোর সামর্থ আমার নেই, তাই সে আমাকে প্ররোচনা দেয় তার চাচার কাছে ৫০ হাজার টাকায় হাফসাকে বিক্রি করে দিতে। আমি বিক্রি করছি কিন্তু আমাকে টাকা দেয়নি, কোথাও স্বাক্ষরও করেনি, বলছে পরে টাকা দিবে। এই কথা বলে আমার আমার কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে যায়। আমার পরিবারে কোন অভাব-অনটন নেই তবুও আমি কেন এমন কাজ করেছি আমি বুঝতে পারিনি। কোনো মা এই কাজ করতে পারে না, আমি আমার শিশু সন্তানের প্রতি অন্যায় করেছি, আমার ভুল হয়েছে আমি সকলের কাছে ক্ষমা চাই।
শিশুটিকে দত্তক নেওয়া আবু সাঈদ বলেন, আমি শিশুটিকে দত্তক নিয়ে ঢাকায় নিজ বাসায় চলে আসি। এরপর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেবিদ্বারে শিশু অপহরণের খবর জানতে পারি। তখন আমি যার সহযোগিতায় শিশুটিকে দত্তক নিয়েছি তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। ঘটনার সত্যতা পেয়ে সিদ্ধান্ত যার সন্তান তার কাছে ফিরিয়ে দেব। পরে আমি আল মদীনা জেনারেল হাসপাতালে এসে পুলিশ, চিকিৎসক ও নার্সর উপস্থিতিতে শিশুকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করি। আকলিমা স্বেচ্ছায় শিশুটিকে দত্তক দিয়েছিলেন। পরদিন তার স্বামীকে নিয়ে এসে চুক্তিপত্রে সই করে টাকা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে তিনি কেন নিজের সন্তানের অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন তা আমি জানিনা। আমরা তার সন্তানকে ফেরত দিয়েছি।
শিশু হাফসার বাবা মো. কামাল হোসেন বলেন, আমি দিনমজুরে কাজ করে সন্তানদের লালন-পালন করি। আমার সংসারে কোন অভাব অনটন নেই। তারপরও আমার স্ত্রী কাউকে জানিয়ে আমার ২৭ দিন বয়সী মেয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকার লোভে বিক্রি করে দেয়। পরে সে বাঁচার জন্য অপহরণের নাটক সাজায়। আমাকে যদি ৫ লাখ টাকাও দেয় তবুও আমি আমার মেয়ে বিক্রি করব না।
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, শিশুটির মা আকলিমা বেগম স্বেচ্ছায় তার সন্তানকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে অপহরণের নাটক সাজায়। আমরা প্রথমেই বিষয়টি সন্দেহ করি। পরে সিসি টিভি ফুটেজ ও তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রায় ৩৫ ঘন্টা পর শিশুটিকে দত্তক নেওয়া ওই দম্পত্তির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা শিশুটিকে নিয়ে দেবিদ্বারে আসেন। পরে সবার উপস্থিতিতে হাফসাকে তার পরিবারে কাছে হস্তান্তর করা হয়।